ক্লিওপাত্রার ডুবে যাওয়া প্রাসাদে মিলল বিরল আংটি, তাতে প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের ছবি
মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার ডুবে যাওয়া রাজকীয় বন্দরে পাওয়া গেছে একটি প্রাচীন ব্রোঞ্জের আংটি, যাতে খোদাই করা আছে আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘরের ছবি—প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের একটি। ক্লিওপাত্রার সঙ্গে যুক্ত ডুবে যাওয়া প্রাসাদের এলাকায় এই আবিষ্কারের কথা সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
আবিষ্কারটি করা হয়েছে আলেকজান্দ্রিয়ার ডুবে যাওয়া রাজকীয় বন্দরে এবং এ মাসে তা ঘোষণা করেছে ইউরোপীয় পানির নিচের প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউট। আংটিটি পাওয়া গেছে ডুবে যাওয়া আন্তিরোদোস দ্বীপে একটি রাজপ্রাসাদের স্থানে।
আন্তিরোদোস ছিল আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীন রাজকীয় এলাকার অংশ, যার সঙ্গে ক্লিওপাত্রা সপ্তম, মার্ক অ্যান্টনি এবং জুলিয়াস সিজারের নাম যুক্ত। সেই ক্ষমতার কেন্দ্রের মাটিতেই আংটিটি পাওয়ায় এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে গবেষকরা বলছেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্রোঞ্জের আংটিটিতে আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘরের ছবি রয়েছে। সিল মারার কাজে ব্যবহৃত সিগনেট আংটির মধ্যে এটিই প্রথম পরিচিত নমুনা যাতে এই বিখ্যাত স্থাপনার ছবি রয়েছে।
বাতিঘরটি নির্মিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি জাহাজকে পথ দেখিয়েছে, পরে কয়েক শতাব্দী ধরে ভূমিকম্পে ধ্বংস হতে হতে চতুর্দশ শতকের দিকে এর চূড়ান্ত পতন ঘটে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আংটিটির বয়স এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ৭ অক্টোবরের প্রকাশনায় বলা হয়েছে, এর ছবির ধরন দ্বিতীয় শতকের কিছু মুদ্রায় পাওয়া ছবির সঙ্গে মিলে যায়। প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায় ছোট, আবহাওয়ায় ক্ষয়প্রাপ্ত একটি আংটি, যার সোনালি-রঙা পৃষ্ঠে বাতিঘরের হালকা খোদাই রয়েছে।
ইউরোপীয় পানির নিচের প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও খনন দলের নেতা ফ্রাঙ্ক গোদিও আংটিটি কোথায় পাওয়া গেছে, তার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, আংটি-সিগনেটটির আবিষ্কার আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি খনন করা হয়েছে আন্তিরোদোস দ্বীপের কিংবদন্তি প্রাসাদে, যা একসময় ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল।
কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের প্রাচীন ইতিহাসের প্রভাষক আলেকজান্দ্রা এফ. মরিস পানির নিচে খননের কাজকে অত্যন্ত যত্নসাপেক্ষ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, সবকিছু ডুবুরিদেরই খুঁজে বের করতে হয়, নথিভুক্ত করতে হয় এবং তুলে আনতে হয়।
মরিসের মতে, ক্লিওপাত্রা একসময় যে প্রাসাদ ব্যবহার করে থাকতে পারেন, সেটি পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে এবং সম্ভবত আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘরের কার্যক্রম তদারকির সঙ্গে যুক্ত ছিল। আংটির ছবি সেই প্রশাসনিক যোগেরই প্রতিনিধিত্ব করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে মরিস সতর্ক করে বলেছেন, আংটির বয়স এখনো অজানা—এটি টলেমীয় বা রোমান, যেকোনো আমলের হতে পারে। তবু নিদর্শনটি প্রাচীন শহরটির কাছে বাতিঘরের গুরুত্ব তুলে ধরে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর ভাষায়, বাতিঘরটি এখন ছোট হয়ে কারও আঙুলে বসেছে এবং সরকারি কাগজপত্রে সিল দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি মূলত দেখায়, নির্মাণের অনেক পরেও বাতিঘরটি আলেকজান্দ্রিয়ার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।
ঐতিহাসিক গুরুত্বের বাইরেও আংটিটি আলেকজান্দ্রিয়ার পানির নিচের ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজে পৌঁছে দিতে সাহায্য করতে পারে বলে মরিস মনে করেন। শহরটি পানির নিচে থাকায় সেখানে পৌঁছানো কঠিন; আংটির মতো বস্তুর প্রতিলিপি বা মডেল মানুষ হাতে ধরে দেখতে পারবে।
জাদুঘর পেশাজীবী হিসেবে মরিস আংটিটিকে স্পর্শভিত্তিক প্রদর্শনীর জন্য ‘নিখুঁত বস্তু’ বলে বর্ণনা করেছেন, যা অন্ধ ও কম দৃষ্টিশক্তির দর্শনার্থীসহ স্থানটি সম্পর্কে আগ্রহীদের জন্যও উপযোগী হতে পারে। এখন এই বিরল নিদর্শন ঘিরে আরও গবেষণা কী তথ্য দেয়, সেদিকেই নজর থাকবে।


