উচ্চ রক্তচাপ এখন দেশের শীর্ষ রোগ, নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়নের দাবি কর্মশালায়
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বাজেটের বরাদ্দ বাড়ানো এবং ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য ও গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, বর্ধিত বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই খাতে ব্যয় করা গেলে হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি ও মৃত্যু কমানো সম্ভব।
রবিবার রাজধানীর বিএমএ ভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক কর্মশালায় এই আহ্বান ওঠে। কর্মশালার বিষয় ছিল বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়ন—এর অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের সহযোগিতায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা কর্মশালাটির আয়োজন করে।
কর্মশালায় প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের ২৮ জন সাংবাদিক অংশ নেন। আলোচনায় উঠে আসে রোগটির বিস্তার ও তার পরিণতির উদ্বেগজনক চিত্র, যার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয় সরকারি জরিপের তথ্য।
কর্মশালায় জানানো হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫ অনুযায়ী দেশের শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ। অর্থাৎ কোনো একক রোগ হিসেবে এটিই এখন দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষকে আক্রান্ত করছে।
মৃত্যুর হিসাবেও রোগটির প্রভাব বড়। কর্মশালায় উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালে দেশে হৃদরোগে প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এসব মৃত্যুর ৫২ শতাংশের জন্য উচ্চ রক্তচাপ দায়ী।
আরেকটি উদ্বেগের দিক হলো তরুণদের মধ্যে প্রকোপ বাড়া। বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে, ২০১৮-এর তথ্য অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। ফলে রোগটিকে আর শুধু বয়স্কদের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে আলোচনায় ইঙ্গিত মেলে।
এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয় ও বিপণন) মো. রিয়াদ আরেফিন বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বর্ধিত বরাদ্দ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিনা মূল্যে ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আখতার মালা বরাদ্দের অসমতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ ঘটে অসংক্রামক রোগের কারণে, অথচ এসব রোগ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে। বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি বলেন।
জিএইচএআই বাংলাদেশের কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং এই রোগ নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়ন জরুরি। এককালীন বা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে নয়, ধারাবাহিক অর্থের জোগান থাকলেই ওষুধ সরবরাহ ও সেবা টিকিয়ে রাখা যাবে—তার বক্তব্যে সেই যুক্তিই প্রাধান্য পায়।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের। বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির প্রোগ্রাম অফিসার সামিহা বিনতে কামাল। উপস্থাপনা ও আলোচনায় বাজেট, ওষুধের সরবরাহ এবং প্রতিরোধ—এই তিনটি দিককে একসঙ্গে দেখার ওপর জোর দেওয়া হয়।
বক্তাদের বক্তব্য থেকে যে চিত্রটি স্পষ্ট হয়, তা হলো—উচ্চ রক্তচাপ শুধু চিকিৎসার প্রশ্ন নয়, এটি অর্থায়নের প্রশ্নও। বাজেটে অগ্রাধিকার, সরকারি পর্যায়ে ওষুধের ধারাবাহিক সরবরাহ এবং সচেতনতা—এই তিনের সমন্বয় ছাড়া হৃদরোগজনিত মৃত্যু কমানো কঠিন হবে।
আগামী বাজেট বাস্তবায়নের পর্যায়ে বর্ধিত স্বাস্থ্য বরাদ্দের কতটা অংশ অসংক্রামক রোগ, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কর্মশালার আহ্বান অনুযায়ী সেই বরাদ্দ নিশ্চিত হলে প্রান্তিক রোগীদের বিনা মূল্যে ওষুধ পাওয়ার সুযোগও টেকসই হবে।



